জুলাই ১
আওয়ামী লীগ শাসন পতনের অভূতপূর্ব সূচনা
-
আপলোড সময় :
০১-০৭-২০২৫ ০২:৪৪:৫২ অপরাহ্ন
-
আপডেট সময় :
০১-০৭-২০২৫ ০২:৫৫:৪৯ অপরাহ্ন
ছবি- বাসস
গত বছরের ১ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই দিনেই দেশের শিক্ষার্থীদের এক প্রতিবাদ থেকে সৃষ্টি হয় একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান, যা প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ আন্দোলন একসময় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুধু কোটা সংস্কার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তাদের দাবির পরিসর ক্রমশ বড় হতে থাকে এবং একটি বৃহত্তর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলে ছাত্ররা, সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক, শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বৃহৎ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এ আন্দোলনের সূচনা ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি প্রজ্ঞাপনের পর হাইকোর্ট কর্তৃক পুনর্বহাল রায়ের প্রেক্ষিতে ঘটে। ২০১৮ সালে তীব্র ছাত্র আন্দোলনের পর সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করেছিল, কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে কোটা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, পশ্চাৎপদ জেলার জন্য ১০ শতাংশ, সংখ্যালঘুদের জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়। ছাত্ররা এই পুনঃপ্রবর্তনকে মেধাবীদের প্রতি বৈষম্য হিসেবে মনে করে প্রতিবাদে রাস্তায় নামে।
সরকার তাদের প্রতিবাদ দমন করতে চাইলে পরিস্থিতি বিদ্রোহে রূপ নেয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারপন্থী সন্ত্রাসীরা একযোগে আক্রমণ চালালে অন্তত ১,৪০০ জন নিহত এবং প্রায় ২০,০০০ জন আহত হয়। এটি ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর দমনপীড়ন। ২০০৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ছিল আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে ২০২৪ সালের ১ জুলাই, কিন্তু এর গোড়াপত্তন ৫ জুন ঘটে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার বই “জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু”তে লিখেছেন, ৫ জুন বিকেলে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে স্কুটি মেরামত করাচ্ছিলাম। তখন ফেসবুকে দেখি হাইকোর্ট কোটা পুনর্বহাল করেছে। মনে হলো ২০১৮ সালের অর্জনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
এরপর ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক বৈঠক শুরু হয় এবং রাতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ ব্যানারে একটি মিছিল বের হয়। এতে স্লোগান ওঠে, "কোটা পদ্ধতি মানি না, হাইকোর্টের রায় মানি না, কোটা বাতিল করতেই হবে।" আন্দোলন দ্রুত অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছড়িয়ে পড়ে।
৬ জুন ঢাবি, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করে। ৯ জুন শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করে অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। এর পরপরই রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে। শুনানির দিন ধার্য হয় ৪ জুলাই।
১০ জুন আবারও মিছিল হয় এবং শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুনের মধ্যে ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপন পুনর্বহাল করতে আল্টিমেটাম দেয়, না হলে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দেয়। আসিফ সজীব ভূঁইয়া স্মরণ করেন, আমরা ঈদের ছুটির আগে ৩০ জুন পর্যন্ত আন্দোলন শিথিল রেখেছিলাম, কিন্তু ৩০ জুন সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ঘোষণা না আসায়, ১ জুলাই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরুর ঘোষণা দেন।
১ জুলাই ঢাবি, জাবি, রাবি, চবি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে পড়ে। ঢাবির শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে মিছিল বের করে, যা রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়।
এদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও পরীক্ষার বর্জন চলবে। তিনি আরও তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন: ২ জুলাই দেশব্যাপী মহাসড়কে মিছিল, ৩ ও ৪ জুলাই রাজধানীতে সমাবেশ।
এই আন্দোলন সময় গড়ানোর সাথে সাথে দেশের সাধারণ মানুষও এতে যোগ দিতে শুরু করে, যা এই প্রতিবাদকে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত করে। নাহিদ ইসলাম চারটি দাবি উত্থাপন করেন- ১. দ্রুত কোটা সংস্কারে কমিশন গঠন, ২. কোটা পূরণ না হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা, ৩. একাধিকবার কোটা সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, ৪. প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, যেখানে ছাত্ররা এবং সাধারণ জনগণ একত্রিত হয়ে ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য দাবি জানায়। সেই আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া জনগণের ঐক্য আজ নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার আশা দেখিয়েছে।
সূত্র: বাসস
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক
কমেন্ট বক্স